দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এর ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১১ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে ২৫৯ জন হামের উপসর্গে এবং ৫২ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১,৩০২ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ১,০২৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং ১৫৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। যদিও বছরের শুরুতেই সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে, তবে ১৫ মার্চ থেকে নিয়মিতভাবে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে মোট ৪১,৭৯৩ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে, ২৮,৮৪২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ৫,৪৬৭ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সমন্বয়ের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পাওয়া এবং প্রাথমিক পর্যায়ে অক্সিজেনের অভাব মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় আইসিইউ ও পিআইসিইউ সুবিধার অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম সরাসরি মৃত্যুর কারণ না হলেও এর জটিলতাগুলো অত্যন্ত মারাত্মক হয়ে উঠছে। আক্রান্ত শিশুদের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মৃত্যু নিউমোনিয়ার কারণে হচ্ছে। এছাড়া সেপটিসেমিয়া, এনসেফালাইটিস, অপুষ্টি এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে আগে থেকেই নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যুর সমস্যা ছিল, কিন্তু তা মোকাবেলায় দীর্ঘদিন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে হামের প্রাদুর্ভাব সেই দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তারা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতিকে উচ্চঝুঁকির হিসেবে বিবেচনা করলেও দেশে পূর্ণাঙ্গ জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলেও মাঠ পর্যায়ে জনবল সংকট, সমন্বয়হীনতা, কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং টেস্টিং কিটের অভাব প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতার ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
এ ধরনের উচ্চসংখ্যক মৃত্যুর ঘটনা দেশে আগে দেখা যায়নি। অতীতে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু এলাকায় হামজনিত মৃত্যু হলেও বর্তমান পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ভয়াবহ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হাসপাতালগুলোতে ডেথ রিভিউ করা হচ্ছে এবং বিশেষায়িত ইউনিট চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকা দিয়ে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ। তারা আরও বলেন, শুরুতেই প্রাদুর্ভাব ঘোষণা না করায় সচেতনতা তৈরি হয়নি এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল থেকেছে। জাতীয় নির্বাচন ও ঈদের সময় ব্যাপক ভ্রমণের কারণে সংক্রমণ দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
সবশেষে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ মোকাবেলায় এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।









