দেশের অন্যতম ধান মাঠ নামে পরিচিত সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের গুয়াছুড়া অংশে এখন দাঁড়ালে মনে হয় এটা কোনো ধানের মাঠ নয়, বিশাল জলরাশি। বাতাসে কাঁপছে না ধানের শীষ, কাঁপছে মানুষের বুক।
চারদিকে থইথই পানি, তার নিচে চাপা পড়ে আছে সোনালি স্বপ্ন। কয়েক দিন আগেও যেখানে সোনালি ধান দুলছিল, আজ সেখানে ভাঙা স্বপ্নের নিঃশব্দ চিহ্ন। গতকাল বুধবার কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত পলিথিনে মোড়া, যেন বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকার শেষ চেষ্টা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে কাটা ধানের আঁটি বেঁধে দিচ্ছিলেন কৃষক রইছ মিয়া। চোখের কোণে জমে থাকা পানি আর বৃষ্টির পানির পার্থক্য বোঝা যাচ্ছিল না। প্রশ্ন করতেই গলা ধরে এলো তাঁর। কান্না কারতে করতে বলেন, ‘ধানের ওপরে তিন-চার হাত পানি। কীভাবে কাটমু? যা ছিল, সব ভেসে গেল। চোখের সামনে তলিয়ে গেল সোনার ধান। ধানই আমাদের জীবন। আর সেই জীবনটাই এখন পানির নিচে ডুবে আছে। আমরা নিঃস্ব হয়ে গেলাম।’
এই চিত্র এখন নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। টানা বর্ষণে দেশের হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। যারা জমি থেকে ফসল কাটতে পেরেছেন, তাদের ধানও মাঠে ভিজছে। রোদ না থাকায় শুকিয়ে গোলায় তুলতে পারছেন না কৃষক। এ অবস্থায় বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে কৃষক অসহায় হয়ে পড়েছেন। তারা বলছেন, শুধু বৃষ্টির পানি নয়, নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় এ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। আরও দুয়েক দিন গেলে এই পাকা ধানে পচন ধরবে। বুকের দরদ ঢেলে যে চাষি ফসল ফলিয়েছেন, সে চাষির মাথায় এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
মাঠে মাঠে যখন কৃষকের এমন আর্তনাদ, তখন গতকাল বুধবার বিকেলে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সতর্কবার্তার তথ্য বলছে, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারে বন্যা চলছে। এ দুই জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে এবং অবনতিও হতে পারে। একই সঙ্গে আরেও তিন জেলা– হবিগঞ্জ, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যার সতর্কতার কথা জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, এই অঞ্চলে আগামী তিন দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।
এরই মধ্যে হাওরাঞ্চলে ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সংসদ অধিবেশনে একটি সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা জানান তিনি। এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী জানান, তিন দিন আগে আবহাওয়া প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তিনটি জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল থেকে মেঘালয় চেরাপুঞ্জিতে হওয়া বৃষ্টির পানির ঢলে সুনামগঞ্জে পাহাড়ি নদীসহ ছোট-বড় ৯৭ নদীতে পানি বেড়েছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে হওয়া ভারী বর্ষণে এবং অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতায় পড়েছে ১৯৯টি ছোট-বড় হাওর।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বললেন, বাঁধ ভেঙেছে দুটি। এগুলো হচ্ছে– মধ্যনগরের এরন বিল এবং একই উপজেলার জিনারিয়া বাঁধ। এই বাঁধগুলো বড় হাওরের না হলেও এসব বাঁধ ভেঙে তিনটি ছোট হাওরে পানি ঢুকেছে। জলাবদ্ধতার পানিতে ডুবেছে ৯ হাজার ৪৯ হেক্টর জমি, সব মিলিয়ে পানিতে ডুবে বুধবার বিকেল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ৫০ হাজার টন ধানের ক্ষতি হয়েছে। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কেটি টাকা। তবে কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, এই ক্ষতি আরও অনেক বেশি।
বর্গা চাষিদের সংকট আরও গভীর। নিজের জমি নয়, কিন্তু দায় পুরোপুরি তাদের। ফসল না হলে ঋণ, মালিকের পাওনা, সংসারের খরচ– সব একসঙ্গে এসে চেপে বসে। সুনামগঞ্জের গুয়াছুড়ার বর্গাচাষি কমর আলী বলেন, ‘বারো আনা জমি ডুইবা গেছে। ৭০ হাজার টেকা খরচ কইরা চাষ করলাম। মালিকরে ধান দিমু কেমনে? পোলা-মাইয়া লইয়া কিলা বাঁচতাম?’
দেখার হাওরের বর্গা চাষি কে এম ফখরুল ইসলাম বললেন, ‘এখানে ৭০ শতাংশের বেশি কৃষক কিরাজ (বর্গাচাষ) করে। ঝুঁকি এত বেশি হয়ে গেছে যে, এখন সবাই এই পদ্ধতিতেই করছে। কিন্তু ফসল না হলে কৃষক পুরোপুরি ডুবে যায়।’
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, হাওরে পানি বাড়ছে। বৃষ্টির কারণে কৃষকরা মাড়াই করা ধানও শুকাতে পারছেন না। নানা দিক থেকে কৃষকরা সংকটে আছেন।
শুধু সুনামগঞ্জ নয়, তলিয়ে গেছে পুরো হাওরাঞ্চলসহ অন্য জেলার ফসলও
এই দুর্যোগ শুধু সুনামগঞ্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া– সব জায়গায় একই চিত্র। কোথাও কাটা ধান ভাসছে, কোথাও পাকা ধান তলিয়ে গেছে, কোথাও আবার শ্রমিক না থাকায় কাটাই সম্ভব হচ্ছে না।
কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে কুমিল্লার ফসলের মাঠ। মঙ্গলবার থেকে বুধবার পর্যন্ত চলা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১৭টি উপজেলার হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে হাজারো কৃষকের কপালে। কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলছেন, জেলার ১ হাজার ৭৩৩ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এ ছাড়া ৫৫০ হেক্টর ভুট্টা, ২৩৫ হেক্টর আউশ ধানের বীজতলা এবং ৩৬৪ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হয়েছে।
খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্যমতে, টানা বৃষ্টিতে প্রায় ২২১ হেক্টর বোরো পাকা ধান, ৬৩ হেক্টর সবজি ও ৫৪৮ হেক্টর ফলবাগান ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মৌলভীবাজারের উপপরিচালক জালাল উদ্দিন বলেন, হাওরে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলের ক্ষেত নিমজ্জিত হয়েছে। অন্যদিকে হাওরঘেঁষা অঞ্চলে সবজিক্ষেতের মাচা নিমজ্জিত হয়েছে।
নেত্রকোনায় এবার অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ ক্ষেতে পানি জমে যাওয়ায় ধান কাটার যন্ত্র সেখানে চালানো যাচ্ছে না। আর শ্রমিক সংকট তো আছেই। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত হওয়ায় কৃষকরা মাঠে ধান কাটতে ভয় পাচ্ছেন। গত এক মাসে বজ্রপাতে হাওরে পাঁচজন প্রাণ হারান। অন্যদিকে অতিবৃষ্টির পানিতে পাকা ধান নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে।
নেত্রকোনা মদনের কুলিহাটি গ্রামের কৃষক অজি উল্যাহ বলেন, ‘গতকাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হইতাছে। ১৪০০ টেহা রোগ দিয়া কামলা ঠিক করছিলাম। কিন্তু বজ্রপাতের ভয়ে শ্রমিকরা ক্ষেতে যাইতাছে না। চোক্ষের সামনে আমার মতো সব কৃষকরার ধান ডুইব্বা যাইতাছে, কিচ্ছু করার নাই।’
নেত্রকোনার খালিয়াজুরির কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, পানিতে বিভিন্ন হাওরে প্রায় ৫০০ হেক্টর ক্ষেতের ধান ডুবে গেছে। এখনও উপজেলায় অর্ধেক ক্ষেতের ধান কাটা বাকি।
গাইবান্ধায় কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে বোরো ধানের জমিতে পানি জমেছে। গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আতিকুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরে জেলায় এক লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। তবে কয়েক দিনের বৃষ্টির পানিতে ২১২ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে।
হাওরের কৃষকদের জন্য বোরো ধানই বছরের একমাত্র ভরসা। সেই ফসল তলিয়ে যাওয়ার মানে শুধু ক্ষতি নয়, পুরো বছরের খাদ্য ও জীবিকার নিশ্চয়তা ভেঙে পড়া। টানা বর্ষণ, উজানের ঢল, পাহাড়ি নদীর পানি বৃদ্ধি– সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে কৃষক প্রস্তুত হওয়ার সুযোগই পাননি। ধান পেকে উঠেছিল, কাটার সময় এসে গিয়েছিল– ঠিক তখনই পানি ঢুকে সবকিছু গ্রাস করে ফেলেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানিয়েছে, হাওরাঞ্চলে ইতোমধ্যে ৫৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে শ্রমিক সংকট ও জলাবদ্ধতার কারণে জমির ধান পরিপক্ব হলেও কৃষকরা তা কাটতে পারছেন না। মাঠে থাকা ধানের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশ বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
দেশের অধিকাংশ চাল উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে, যার প্রায় ২০ শতাংশই আসে হাওরভুক্ত সাত জেলা থেকে। ডিএই সূত্রে জানা যায়– সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া– এই সাত জেলায় এবার ৯ দশমিক ৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ৪ দশমিক ৫৫ লাখ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ৫ দশমিক শূন্য ৮ লাখ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. মো. জামাল উদ্দীন বলেন, মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব করা হচ্ছে। চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে জেলা থেকে ঢাকায় আসবে। অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানান, চেরাপুঞ্জিসহ উজান এলাকায় ভারী বৃষ্টির কারণে আগামী কয়েক দিন নদীর পানি আরও বাড়তে পারে, যা হাওরে চাপ সৃষ্টি করবে।
এই বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম এই বিষয়ে একটি গণমাধ্যমকে জানান, সরকারি হিসাবে কত হেক্টর জমি ডুবেছে, কত টন ধান নষ্ট হয়েছে– এসব হিসাব করা সম্ভব। কিন্তু একটি কৃষক পরিবারের মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় এসবের কোনো পরিমাপ নেই। একজন কৃষক যখন ঋণ নিয়ে চাষ করেন, তখন তিনি শুধু ফসলের আশা করেন না– তিনি একটা ভবিষ্যৎ কল্পনা করেন। সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা, ঘরের খরচসহ সবকিছু সেই ফসলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। ফসল ডুবে গেলে তাই শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় না, ভেঙে যায় সেই ভবিষ্যৎটাও। ফলে দ্রুত কৃষকের পাশে সরকারকে দাঁড়াতে হবে।









