দীর্ঘ ২২ বছরের প্রতীক্ষা, আন্দোলন ও সংগ্রামের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ঐতিহাসিক এক মাইলফলক স্পর্শ করল ইন্দোনেশিয়া। দেশটির পার্লামেন্টে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা আইন’, যার ফলে প্রায় ৪২ লাখ গৃহকর্মী প্রথমবারের মতো আইনি স্বীকৃতি ও শ্রম অধিকার পাচ্ছেন।
২০০৪ সালে প্রথম প্রস্তাবিত এই আইনটি নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক বাধার কারণে দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল। প্রায় দুই দশক পর ২০২০ সালে এটি পুনরায় আলোচনায় আসে এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার আইনটি পাস হওয়ার ঘোষণা আসে। ঘোষণার পরই দেশজুড়ে লাখো গৃহকর্মীর মধ্যে দেখা দেয় উচ্ছ্বাস অনেকেই আনন্দে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।
এক প্রতিক্রিয়ায় গৃহকর্মী আজেং আস্তুতি বিবিসি ইন্দোনেশিয়াকে বলেছেন, এটা যেন স্বপ্নের মতো। প্রান্তিক নারী হিসেবে সুরক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদের ২২ বছরের লড়াই অবশেষে সফল হলো।
নতুন আইনের মাধ্যমে গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতদিন তারা আইনগতভাবে শ্রমিক হিসেবে বিবেচিত না হওয়ায় কোনো ধরনের সামাজিক বা আইনি সুরক্ষা পেতেন না। অথচ এই খাতে কর্মরতদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী, যারা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, অনিরাপত্তা ও শোষণের শিকার হয়েছেন।
আইন অনুযায়ী এখন থেকে গৃহকর্মীরা স্বাস্থ্যবিমা ও পেনশনসহ সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আসবেন। সপ্তাহে নির্দিষ্ট ছুটির দিন নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আগে ছিল না। বেতন থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ কেটে নেওয়ার প্রবণতাও বন্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৮ বছরের নিচে কাউকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আইন ইন্দোনেশিয়ার শ্রমবাজারে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে। কারণ এতদিন গৃহকর্মীরা চুক্তিহীনভাবে দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য হতেন এবং ন্যায্য মজুরি থেকেও বঞ্চিত থাকতেন। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদেরও এই পেশায় যুক্ত করা হতো, যা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।
মানবাধিকার সংগঠন জালা পিআরটি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গৃহকর্মীদের ওপর ৩ হাজার ৩০০টির বেশি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সংস্থাটির প্রতিনিধি লিতা আংগ্রাইনি বলেন, আইন পাস হওয়া একটি বড় অর্জন হলেও বাস্তব প্রয়োগই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকার জানিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে এই আইনের বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিস্তারিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করছে, আইন কার্যকর করতে নিয়োগকর্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর নজরদারি অপরিহার্য।
সব মিলিয়ে, ইন্দোনেশিয়ায় গৃহকর্মীদের জন্য এই আইন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর।









