হাম প্রতিরোধে যে পদক্ষেপগুলো সবচেয়ে জরুরি
প্রকাশ:

বিস্তারিত
মেসেলস বা মরবিলি ভাইরাসের কারণে হওয়া হাম অত্যন্ত সংক্রামক। শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে, যার ফলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডা. কাকলী হালদার, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক, সতর্ক করছেন-এ রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো সঠিক সময়ে এমআর টিকা নেওয়া। পাশাপাশি মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, পুষ্টিকর খাবার এবং হাত ধোয়ার মতো সাবধানতা মেনে চললে হামমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
হাম প্রতিরোধে যা করতে পারেন—
মাস্ক পরুন
মাস্ক আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ভাইরাস ছড়ানো কমিয়ে ফেলতে পারে উল্লেখযোগ্য মাত্রা। একই সঙ্গে এটি সুস্থ মানুষকে আক্রান্ত করার পরিমাণও কমিয়ে দেয়।
মাস্ক আক্রান্ত ব্যক্তির নাক ও মুখ থেকে বের হওয়া শ্বাসপ্রশ্বাস, কাশি বা হাঁচির ফোঁটাগুলো বা ড্রপলেট বাতাসে ছড়ানোর ক্ষেত্রে বাধা দেয়। এন৯৫ বা কেএন৯৫ মাস্ক এ ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। কারণ, এ ধরনের মাস্কগুলো ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কণা ছেঁকে ফেলতে পারে। সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্কও কিছুটা সুরক্ষা দেয়।
কখন ব্যবহার করবেন মাস্ক
জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি হামের লক্ষণ দেখা দিলে মাস্ক পরুন।
চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে যাওয়ার সময় বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরুন।
২ বছরের বেশি বয়সী সবাই মাস্ক পরতে পারে।
শরীরে হামের লক্ষণ দেখা না দিলেও মাস্ক ব্যবহার করুন। এতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে। এ ছাড়া বায়ুজনিত অন্যান্য দূষণ থেকেও সুরক্ষা পাওয়া যায় মাস্ক ব্যবহারের কারণে।
মাস্কের কার্যকারিতার তুলনা
মাস্কের মধ্যে এন৯৫ বা কেএন৯৫ সবচেয়ে ভালো ফলাফল দেয়। এ ধরনের মাস্ক ৯৫ শতাংশের বেশি কার্যকর। এগুলো টাইট ফিট বলে সূক্ষ্ম কণা প্রতিরোধ করে বেশি।
সার্জিক্যাল মাস্ক মাঝারি মাত্রার প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। এগুলো ৫০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত জীবাণু প্রতিরোধ করতে পারে। তবে ফাঁক থাকে বলে জীবাণু ছাড়ায়।
সাধারণ কাপড়ের মাস্ক শুধু অস্থায়ী সুরক্ষা দেয়। এগুলো ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত জীবাণু প্রতিরোধ করতে পারে।
মাস্ক ব্যবহারের সঠিক নিয়ম
নাক-মুখ পুরোপুরি ঢেকে টাইট করে পরুন।
২ বছরের বেশি বয়সী সবাই ব্যবহার করতে পারে।
হামের লক্ষণ দেখা দিলে ব্যবহার করতে শুরু করুন।
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় এবং বেশি মানুষের মধ্যে চলাফেরার সময় মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক।
মাস্ক ছাড়াও হাম প্রতিরোধে বেশ কিছু কার্যকর সুরক্ষা পদক্ষেপ রয়েছে। এগুলো বিশেষ করে হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কোভিড-১৯-এ করা কাজগুলো আবারও শুরু করা জরুরি।
প্রধান প্রধান সুরক্ষা পদক্ষেপ
দূরত্ব বজায় রাখুন: আক্রান্ত বা সন্দেহজনক ব্যক্তির সঙ্গে কমপক্ষে ৬ ফুট বা ২ মিটার দূরত্ব বজায় রাখুন। হাম বাতাসে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকে।
হাত ঘন ঘন ধুয়ে ফেলুন: সাবান ও পানি দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুয়ে নিন। অথবা হাত পরিষ্কারের জন্য অ্যালকোহলভিত্তিক স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।
কাশি-হাঁচির শিষ্টাচার: কাশি বা হাঁচার সময় কনুই, টিস্যু, রুমাল, গামছা ইত্যাদি দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখুন। টিস্যু নিরাপদ জায়গায় ফেলে হাত ধুয়ে নিন। রুমাল বা গামছা যখনই সুযোগ পাবেন, পরিষ্কার করে নিন।
ফুসকুড়ি দেখা দিলে আইসোলেশন: শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে ৪ দিন আইসোলেশনে থাকুন। অর্থাৎ বাড়িতে নির্দিষ্ট রুমে বন্ধ থাকুন। এ সময় স্কুল ও কর্মক্ষেত্র এড়িয়ে চলুন।
স্পর্শ এড়ান: অপরিষ্কার হাতে মুখ, নাক, চোখ স্পর্শ করবেন না। দরজার হাতল, টেবিল ইত্যাদি জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করুন।
ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর সুরক্ষায়
লক্ষণ দেখা দিলে শিশু, গর্ভবতী, দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন।
বাইরে থেকে ফিরে পোশাক-জুতা আলাদা রাখুন এবং গোসল করুন।
সুষম খাবার ও পুষ্টি
যেকোনো ধরনের রোগ প্রতিরোধে পুষ্টির কোনো বিকল্প নেই। শরীরে সঠিক পুষ্টি থাকলে মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ঠিক থাকে। তাতে যেকোনো রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় সহজে। সংক্রমিত হলে আক্রান্ত ব্যক্তির খাবারে ভিটামিন ও প্রোটিনযুক্ত এবং পানিসহ প্রচুর তরল খাবার রাখতে হবে।
পুষ্টিবিদ লিনা আকতার জানিয়েছেন, এই রোগে প্রাথমিক পর্যায়ে কমলা ও লেবুর মতো ফলের রস দেওয়া উচিত। কারণ, তখন ক্ষুধামান্দ্য থাকে এবং এসব ফলের রস রুচি বাড়াতে সহায়তা করে। ধীরে ধীরে রোগীকে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় করার জন্য প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি ও ফলমূল রাখতে হবে খাদ্যতালিকায়।
হামে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পর্যাপ্ত তরল, ভিটামিন ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যা রোগের তীব্রতা কমাতে এবং শরীরের পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করে। তবে শুধু একক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; হাম বা অনুরূপ রোগ প্রতিরোধ করতে হলে সার্বিক সমন্বিত পদক্ষেপ, যেমন টিকাদান, সচেতনতা, হাইজিন এবং পুষ্টির সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য।







