ইসলাম কর্মনৈপুণ্য, সহযোগিতা ও যোগ্য সহকর্মীর গুরুত্বকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ও হযরত মুসা (আ.)-এর দোয়ার প্রসঙ্গে দেখা যায়, মুসা (আ.) তাঁর ভাই হারুনকে সহকারী হিসেবে চেয়েছিলেন, যাতে তার মাধ্যমে তিনি শক্তি ও দায়িত্ব পালনে সহায়তা পান (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ২৯–৩৪)। এটি প্রমাণ করে যে, যোগ্য সহকর্মী ও সহযোগিতা সফল কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
অনুরূপভাবে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “যে শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য কর্মচারী হবে, সেই সর্বোত্তম” (সুরা : কাসাস, আয়াত : ২৬)। এ থেকে বোঝা যায়, ইসলামে কর্মদক্ষতা, সততা ও দায়িত্বশীলতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নবী-রাসুলদের জীবনেও দেখা যায়, তারা কখনোই কর্মবিমুখতা বা ভোগবাদিতাকে সমর্থন করেননি; বরং শ্রমকে জীবনাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
ইসলাম মানুষকে সম্মানিত ও মর্যাদাবান সৃষ্টিরূপে ঘোষণা করেছে (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭০)। এই মর্যাদার অংশ হলো তার কর্মক্ষমতা ও সহযোগিতার যোগ্যতা। তাই সমাজে সহকর্মীর প্রয়োজন ও তার সক্ষমতার মানদণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানবস্বভাবের বৈচিত্র্য নিয়ে সাহিত্যিক মোস্তফা লুিফ আল-মানফলুতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, মানুষ চার ধরনের—যারা নিজের ও অন্যের উপকার করে; যারা অন্যের উপকারের মাধ্যমে নিজের লাভ খোঁজে; যারা শুধু নিজের স্বার্থ দেখে; এবং যারা না নিজের, না অন্যের উপকারে আসে। এই বিভাজন সমাজে কর্মনৈতিকতার পার্থক্য তুলে ধরে।
ইসলামে শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, শ্রমিকরা তোমাদের ভাই, তাদের প্রতি সদয় হও এবং তাদের সাধ্যের বাইরে কাজ চাপিয়ে দিও না (বুখারি)। তিনি আরও বলেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও” (বায়হাকি)। এসব নির্দেশনা শ্রমিক অধিকার রক্ষার স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।
বর্তমান সময়ে শ্রমিকদের দুর্দশা, কম মজুরি, দুর্ঘটনা, এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশ নানা প্রশ্ন তৈরি করছে। চাতাল শ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, পরিবহন শ্রমিকসহ নানা পেশার মানুষ আজও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। নারীদের শ্রমের স্বীকৃতিও অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। একইভাবে সাংবাদিক, শিক্ষক ও গবেষকদের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমও অনেক সময় অবমূল্যায়িত হয়।
ইসলাম স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে, ন্যায় ও কল্যাণের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করতে হবে, কিন্তু অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনে নয় (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ২)। সহকর্মীদের প্রতি ভালো আচরণ, সহানুভূতি ও পারস্পরিক সহযোগিতা কর্মক্ষেত্রে শান্তি ও সাফল্যের ভিত্তি।
হাদিসে বলা হয়েছে, “মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখের কষ্ট থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে” (বুখারি)। এমনকি হাসিমুখে কথা বলাকেও সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে (তিরমিজি)।
অতএব, ইসলামী দৃষ্টিতে শ্রম, সহকর্মী ও পারস্পরিক সহযোগিতা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব। সৌহার্দ্য, ন্যায়বিচার ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশই একটি সফল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি।









