বাংলা ও ভারতীয় সংগীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী মান্না দে; সময়ের স্রোত বয়ে গেলেও যার গান আজও সমানভাবে অনুরণিত হয় কোটি ভক্তের হৃদয়ে। আজ এই মহান শিল্পীর ১০৭তম জন্মবার্ষিকী।
১৯১৯ সালের ১ মে জন্মগ্রহণ করেন প্রবোধচন্দ্র দে, যিনি পরবর্তীতে ‘মান্না দে’ নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। সংগীতপ্রেমী পরিবারে বেড়ে ওঠায় ছোটবেলা থেকেই সুরের প্রতি তার গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। তার প্রথম সংগীতগুরু ছিলেন কাকা, প্রখ্যাত শিল্পী কৃষ্ণচন্দ্র দে। সেই সূত্রে ছোটবেলা থেকেই দবীর খাঁ, শচীন দেব বর্মণ ও পংকজ কুমার মল্লিকের মতো গুণী শিল্পীদের সান্নিধ্য পান তিনি।
তবে শুরুতে গায়ক হওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না মান্না দে-র। খেলাধুলায় ছিল তার প্রবল আগ্রহ কুস্তি ও ফুটবল নিয়েই স্বপ্ন দেখতেন তিনি। পরিবারও চেয়েছিল তিনি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবেন। কিন্তু ভাগ্যের লিখন তাকে টেনে নিয়ে যায় সংগীতের জগতে।
স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াকালীন সময়েই তার গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। বন্ধুদের উৎসাহে অংশ নেন আন্তঃকলেজ সংগীত প্রতিযোগিতায় এবং টানা দুই বছর সব বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পুরস্কার হিসেবে পাওয়া রূপার তানপুরাই যেন তার সংগীত জীবনের পথচলার প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৪২ সালে কাকার সঙ্গে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান মান্না দে। প্রথমে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করলেও পরে শচীন দেব বর্মণের অধীনে সংগীতচর্চা করেন। ১৯৪৩ সালে ‘তামান্না’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গায়ক হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি প্রায় ৩৫০০-এর বেশি গান গেয়েছেন, তাও আবার ২৪টিরও বেশি ভাষায়। রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে আধুনিক, চলচ্চিত্রের গান থেকে শাস্ত্রীয় সব ধারাতেই ছিল তার অবাধ বিচরণ। তার কণ্ঠে ধরা পড়েছে প্রেম, বিরহ, দর্শন, নিঃসঙ্গতা আর জীবনের বহুমাত্রিক অনুভূতি।
তার গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’, ‘এই কুলে আমি আর ওই কুলে তুমি’, ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’, ‘যদি কাগজে লেখো নাম’, ‘খুব জানতে ইচ্ছে করে’সহ অসংখ্য কালজয়ী সৃষ্টি।
ব্যক্তিগত জীবনে কেরালার মেধাবী ছাত্রী সুলোচনা কুমারনকে ভালোবেসে বিয়ে করেন তিনি। তাদের সংসারে জন্ম নেয় দুই কন্যা। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সংগীতানুষ্ঠানে অংশ নিয়ে গেছেন তিনি। জীবনের বড় একটি সময় মুম্বাইয়ে কাটালেও শেষ অধ্যায় অতিবাহিত করেন বেঙ্গালুরুতে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন পদ্মশ্রী (১৯৭১), পদ্মভূষণ (২০০৫) এবং দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (২০০৭)। এছাড়াও চারটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।
২০১২ সালে স্ত্রী সুলোচনার মৃত্যু তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। পরের বছর শারীরিক জটিলতায় অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। অবশেষে ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর এই মহান শিল্পী পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।
তবে তিনি নেই এ কথা মানতে নারাজ তার ভক্তরা। কারণ তার কণ্ঠ, তার গান আজও বেঁচে আছে, এবং আগামী প্রজন্মের হৃদয়েও বেঁচে থাকবে চিরকাল।









